অধ্যায়ঃ ১ – বাংলাদেশের কৃষি ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

JSC / কৃষি শিক্ষা

অধ্যায়ঃ ১ – বাংলাদেশের কৃষি ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

কৃষি নির্ভর বাংলার মাটিতে কৃষির সূত্রপাত হয় বহু যুগ আগে। কিন্তু সময়ের সাথে বাংলা ও বাংলার মাটিতে কৃষির উপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে দিন দিন। বর্তমান সময়ে কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদন্ড। শিল্পায়নের যুগে পৃথিবী যখন শিল্প, বিজ্ঞান এইসবে ধাবিত হচ্ছে, আমাদের অর্থনীতি এখনো কৃষিনির্ভর। 

একসময় বিশ্বের ৭৫ ভাগ পাঠ বাংলাদেশ উৎপাদন করলেও ধান ও কৃত্রিম আশঁ ব্যবহারের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় আজ পাঠ চাষে কৃষকদের অনিহা। একসময় বাংলাদেশের বাজারে স্বদেশী পণ্য বিক্রি হলেও এখন আন্তর্জাতিক পণ্য ক্রয় বিক্রয়ে সৃষ্টি হয়েছে প্রতিযোগিতা মুলক বাজারের। 

বাংলাদেশের কৃষি ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের কৃষির অবস্থা এই অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।

অধ্যায় পাঠ শেষে আমরা 

  • কৃষিতে বিজ্ঞানের অবদান ব্যাখ্যা করতে পারবো।
  • বাংলাদেশের আধুনিক কৃষি ফলন ও আমাদের জীবনধারার পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবো।  
  • বাংলাদেশের সাথে কয়েকটি নির্বাচিত দেশের কৃষির অগ্রগতির সম্পর্ক বর্ণনা করতে পারবো।

বাংলাদেশের কৃষির সাথে কয়েকটি নির্বাচিত দেশের কৃষির তুলনা করতে পারবো। 

পাঠ : কৃষিতে বিজ্ঞানীদের অবদান 

কৃষিতে বিজ্ঞানীদের অবদান হলো শিল্পীর রং তুলি দিয়ে শিল্প তৈরির রঙের মতো। মেধা, পরিশ্রম শিল্পীর হলেও,বিভিন্ন রঙ যেমন শিল্পকে রঙিন করে শিল্পকে পূর্ণতা এনে দেয়, ঠিক তেমনই কৃষক   মাঠে পরিশ্রম করে চাষাবাদ করলেও বিজ্ঞানীদের তৈরি নানারকম প্রযুক্তি ও জ্ঞান কৃষিকে পৌছে দেয় লক্ষ্যমাত্রায়। কৃষির উৎপত্তি আদি মানুষদের হাতে হলেও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, এবং কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা জলবায়ু, পরিবেশ, মাটি, পানি, উৎপাদন পদ্ধতি এসব বিষয় বিবেচনায় এনে উচ্চতর গবেষণা করেছেন। তাদের নিরলস গবেষণার ফলস হলো কৃষিতে যুক্ত নতুন নতুন প্রযুক্তি। 

কিন্তু কৃষির সমস্যা ও কম নয় যা দৃষ্টিগোচরে আনা জরুরি ।  বাংলাদেশের কৃষির প্রধান সমস্যাগুলো হচ্ছে–

  • পুষ্টির সমস্যা
  • সার ব্যবস্থাপনা সমস্যা
  • বন্যা ও খরা সমস্যা
  • লবণাক্ততা সমস্যা

উপর্যুক্ত সমস্যাবলি সমাধানে বিজ্ঞানীদের অবদান অসামান্য।পুষ্টি সমস্যার জন্য দেশকে ভাগ করা হয়েছে ক্রিশটি অঞ্চলে।বিভিন্ন অঞ্চলের মাটির প্রকৃতির ভিন্নতা বের করা বিজ্ঞানীদের অসামান্য উদ্ভাবন। এরই ধারাবাহিকতায় সারাদেশের কোন অঞ্চলের মাটিতে কি পরিমাণ সার প্রয়োগ হবে সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেয়া হয় কৃষকদের। সাথে দেয়া হয় পূর্ববর্তী ফসলে প্রয়োগ করা সারের মাত্রার উপর ভিত্তি পরবর্তী ফসলের জন্য সারের সঠিক মাত্রা। এতে কোন কোন সার নিঃশেষ হয়ে যায় না।

বন্যা,খরা লবণাক্ততা বাংলাদেশের প্রধান কৃষি সমস্যা। বিজ্ঞানীরা এই সমস্যা সমাধানে অগ্রসর হয়েছেন। যেমন- বন্যার শেষে ধান চাষের জন্য বিলম্ব জাত হিসেবে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কিরণ ও দিশারী নামে দুইটি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। তাছাড়াও সম্প্রতি বন্যাকবলিত এলাকার জন্য ব্রি ধান-৫১ ও ব্রি ধান-৫২ নামে আরও দুইটি জাতের ধান উদ্ভাবন করেছে। এই দুই জাতের ধানের বিশেষত্ব এই ধান পানির নিচে ১০-১৫ দিন টিকে থাকতে পারে।

বন্যা সহ এই দেশে আছে খরা ও লবণাক্ততার সমস্যা। এই সমস্যা দূরীকরণে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন ব্রি-৫৬,ব্রি-৫৭ নামে খরা সহনশীল ধান। আবার উপকূল অঞ্চলের লবণাক্ততার সমস্যার অবসান পেতে ব্রি ধান-৫৪ ও ব্রি ধান-৪৭ উদ্ভাবন হয়েছে।

এইভাবেই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে কৃষকরা কৃষিতে যোগ করেছেন নতুন মাত্রা। যেমন- ঝিনাইদহের হরিপদ কাপালি হরিধান নির্বাচন করেছেন। আবার কিছু উদ্ভিদের বিশেষ অঙ্গ বীজ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কারন এই বীজের প্রজননে মাতৃগাছের হুবুহু গুণাগুণ পাওয়া যায়। 

কৃষির সঙ্গে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার কর্মকান্ড জড়িত। কৃষিতত্ত্ব ছাড়াও মৃত্তিকা বিজ্ঞান, কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন ইত্যাদি শাখার বিজ্ঞানীরা তথ্য ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রয়োগের মাধ্যমে অবদান রাখছেন। বিশেষ গবেষণার জন্য উন্নত দেশের মতো আমাদের দেশেও বিভিন্ন গবেষণা ইন্সটিটিউট আছে। এসব ইনস্টিটিউট ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা কৃষির বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছেন। 

পাঠ: বাংলাদেশের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি এবং কৃষির আধুনিকায়ন

জীবন, সংস্কৃতি, কৃষি এক সুতোয় গাঁথা। বাংলাদেশের মানুষের জীবনের সাথে কৃষির সম্পর্ক রয়েছে সেই আদিকাল থেকে। সময়ের পরিক্রমায় কৃষিতে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। এই আধুনিকতা ও উন্নয়ন প্রযুক্তির প্রয়োগ যোগ করেছে বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন মাত্রা।  সারাবছর অভার অনটনের পাশাপাশি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে যখন দুর্ভিক্ষ সমগ্র বাংলাকে গ্রাস করেছিলো মৃত্যু হয়েছিলো লক্ষ লক্ষ পূর্ব বাংলার মানুষের। মহাযুদ্ধে দুর্বল হওয়ার পরও ওই সময়কার ব্রিটিশ সরকার নেয় যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। আসাম ও বাংলার জন্য ঢাকা শেরে বাংলা নগরে একটি কৃষি ইন্সটিটিউট, কুমিল্লায় একটি ভেটেনারি কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অনুষদ খুলে ড্রিগি পর্যায়ে কৃষি শিক্ষা চালুর ব্যবস্থা করে। সাথে কৃষি বিভাগ নামে একটি বিশেষায়িত দপ্তর চালু হয়। তাৎক্ষণিক ফলাফল দেখা না গেলেও বাংলাদেশের কৃষির আধুনিকায়নের যাত্রা শুরু হয় এইভাবেই। ১৯৬১ সালে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। এদেরই দিকনির্দেশনায় তৃনমূল পর্যায়ে কাজ করার দক্ষ মাঠ কর্মী তৈরি করতে কিছু কৃষি সম্প্রসারণ ট্রেনিং ইন্সটিটিউট ও পশু চিকিৎসা ইন্সটিটিউট (AETI & VTI) স্থাপন হয়। সরকারি কৃষি ফার্ম, পোল্ট্রি ফার্ম, এবং কোথাও কোথাও ডেইরি ফার্ম চালু হয় প্রদর্শনী খামার হিসেবে। এছাড়াও পাট, আখ, চা, ইত্যাদি অর্থকরী ফসলের বিষয়ে গবেষণার জন্য একক গবেষণা ইন্সটিটিউট যথাক্রমে ঢাকা, ঈশ্বরদি ও শ্রীমঙ্গলে স্থাপিত হয়। গাজীপুর কৃষি গবেষণা ও ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট স্থাপন করা হয়।

এই সব আয়োজনের ফলাফল হিসেবে পূর্ব বাংলায় কৃষি আধুনিকায়ন শুরু হয় গত শতকের ষাটের দশকে। বাংলাদেশের প্রধান কৃষি ফসল হলো ধান। বিভিন্ন স্বাদগন্ধের কম ফলনশীল স্থানীয় ধানের পরিবর্তে বেশি ফলনশীল ইরি, ব্রি ধানের চাষ শুরু হয় ফলে বাড়তি সার, সেচ,ও অন্যান্য পরিচর্যার জন্য উৎপাদন ব্যায় বাড়তে থাকে। যার ফলে দরিদ্র কৃষকেরা ক্ষেতমজুর নাহয় ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে শহরে এসে পড়ে নতুন পেশা খোঁজে। কৃষিতে বিভিন্ন ফসলের উচ্চতর ফলন, পশুজাত দ্রবাদি যেমন – ডিম, দুধ, মাংস, ইত্যাদির মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি হয় ও গ্রামীণ জীবনে বিস্তার ঘটে।

কৃষির মূল ক্ষেত্র হলো মাটি বা জমি।তাই এই মাটি নিয়ে বিজ্ঞানীদের গবেষণার শেষ নেই। গঠন, প্রকারভেদ, উর্বরতা, মাটিতে বসবাসকারী অনুজীব ও এদের উপকারিতা সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা অনেক তথ্য আবিষ্কার করেছেন। 

বর্তমানে বাংলাদেশে চারটি পূর্নাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি পূর্নাঙ্গ ভেটেনারি বিশ্ববিদ্যালয় চালু রয়েছে। পড়ানোর পাশাপাশি প্রায় সকল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকগণ গবেষণা করে থাকেন। তাদেরই গবেষনার হাত ধরেই উন্নত জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি সম্পর্কে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও মাঠকর্মীরা কৃষকদের অবহিত করেন। ফলস্বরূপ কৃষি উৎপাদনে দ্রুত অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে। ‘হাইব্রিড রাইস’ নিয়মকানুন মেনে চাষ করলে প্রচলিত উচ্চ ফলনশীল ধানের চেয়েও বেশি ফলন হয়। 

কৃষি উৎপাদনের এই অগ্রগতি গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনেছে। উৎপাদন বৈচিত্র্যের পাশাপাশি বেড়েছে প্রতিযোগিতা। মাছ, মুরগি ও ডিম উৎপাদন এখন প্রায় শিল্প পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের চাহিদা গ্রামীণ জনজীবনে দ্রুতই বাড়ছে।

পাঠ – ৩ : বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কৃষির অগ্রগতি 

বর্তমানে কৃষি শিল্পের কাছাকাছি পৌছে গিয়েছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের পাশাপাশি দেশগুলোকে ভাগ করা হয় শিল্পোন্নত ও কৃষি প্রধান দেশ হিসেবে। শিল্পোন্নত দেশগুলো কৃষিতেও উন্নত। অন্যদিকে ‘কৃষিনির্ভর’ দেশের সরকার বা কৃষক সমাজ শুধু অর্থনৈতিক কারনে উন্নত কৃষি প্রযুক্তি আত্মস্থ ও ব্যবহার করতে পারছেনা। মূলত আজ অনুন্নত দেশগুলো কৃষিতে অনুন্নত এবং উন্নত দেশগুলো কৃষিতেও উন্নত।

স্বাধীন বাংলাদেশে কৃষির অগ্রগতি : স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রাকালে দেশে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়,একটি কৃষি কলেজ, একটি ভেটেনারি ট্রেনিং ইন্সটিটিউট ও কয়েকটি কৃষি সম্প্রসারণ ট্রেনিং ইন্সটিটিউট ছিলো। এখন চারটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি ভেটেনারি বিশ্ববিদ্যালয় চালু আছে।  বর্তমানে সকল কৃষকের ফসলের জন্য বিশেষায়িত গবেষণাগার রয়েছে। প্রতি বছর শহর ও গ্রামাঞ্চলে কৃষি মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। Integrated Pest Management (IPM) সহ উন্নত কৃষি কার্যক্রমে কৃষকদের উৎসাহিত ও দক্ষ করে তোলার বিবিধ কার্যক্রম চালু হয়েছে। কৃত্রিম রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরশীলতা কমানোর জন্য সবুজ সার এবং কম্পোস্ট সার তৈরি ও ক্ষেতে প্রয়োগ, কেঁচো জাত সার বা ভার্মিকম্পোস্ট প্রয়োগ সংক্রান্ত প্রযুক্তি কৃষকদের হাতে পৌঁছানো হচ্ছে। 

গবাদি পশুর খাদ্য ঘাটতি মেটানোর জন্য উন্নত গো খাদ্য, ঘাস প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পোল্ট্রি ও মৎস খাদ্য তৈরিতে এখন বিপুল অগ্রগতি হয়েছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি পর্যায়ের শিক্ষা সম্প্রসারিত হয়েছে। বায়োটেকনোলজি বা জীবকৌশল বিজ্ঞানে অগ্রগতি বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। বাংলাদেশি বিজ্ঞানী কতৃক পাটের জেনেটিক ম্যাপ আবিষ্কার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা, অর্থাৎ বাংলাদেশে কৃষির আধুনিক যুগের সূচনা হয়েছে।

ভারতের কৃষি : ভারত আমাদের পার্শ্ববর্তী বন্ধু রাষ্ট্র। ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের দেশ ভারতের কিছু মরু অঞ্চল ছাড়া, সমগ্র পার্বত্য ও সমতল অঞ্চলই কৃষিপ্রধান। কৃষি পরিবেশেও দেশটি বৈচিত্র্যময়।ফলে শস্য, ফুল, ফল,মাংস, মাছ,ডিম এমন কোনো কৃষিজ পন্য নেয় যেইটা ভারতে উৎপন্ন হয় না বা বাজারে নেই। ভারতীয় কৃষিজ পন্যের অন্যতম আমদানিকারক দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ।

চীনের কৃষি : বিশ্বের সর্ববৃহৎ জনসংখ্যার দেশ হওয়া সত্ত্বেও পরিকল্পিত উৎপাদন, বন্টন এবং সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার ফলে চীনে কখনো খাদ্য সংকট দেখা দেয় না। প্রতি হেক্টরে সর্বোচ্চ পরিমাণ ধান, গম, ভুট্টা উৎপাদনের ক্ষমতা চীনের কৃষক ও বিজ্ঞানীদের আছে। হাইব্রিড ধানের জনক চীন। চীনের প্রযুক্তি শেখা ও মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগ করা বর্তমান সময়ের দাবী।

ভিয়েতনামের কৃষি : বর্তমান পৃথিবীর প্রধান চাল রপ্তানিকারক দেশ ভিয়েতনাম। এইক্ষেত্রে তাদের কৃষক সমাজ ও কৃষির অবদান বিরাট। তাদের থেকে আমাদের শেখার অনেক কিছু আছে।

কৃষির উন্নয়নের বিষয়টির জন্য জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে “ খাদ্য ও কৃষি সংগঠন “ ( Food And Agricultural Organization, FAO) কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়াও রয়েছে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের ( International Rice Research Institute, IRRI, Philippines) মতো বিশেষ ফলসভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। আমাদের দেশের কৃষির উন্নয়নে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান অপরিসীম।

পাঠ : এশীয় বিশ্বপ্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কৃষির তুলনা

বাংলাদেশ, ভারত চীন ও ভিয়েতনাম এই চারটি দেশই এশিয়া মহাদেশে অবস্থিত। এদের ভৌগোলিক সাদৃশ্য বৈসাদৃশ্যতার পাশাপাশি রয়েছে খাদ্যাভ্যাসের বিভিন্নতা। কিন্তু এই চারটি দেশেই প্রধান কৃষি ফসল ধান ও প্রধান খাদ্য ভাত। জনবহুল দেশ হিসেবে ভারত, বাংলাদেশ ও চীন অন্যতম।

বাংলাদেশ ভারত : কৃষি ও শিল্পের দিক দিয়ে চীন বাংলাদেশ থেকে উন্নত। চীন ধানের বংশগতিতে এমনভাবে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে যে তাদের অধিকাংশ ধানের জাত আর মৌসুম নির্ভর নেই। চীন দাবি করেছে ভবিষ্যতে তাদের ‘ সুপার হাইব্রিড ’ ধান বর্তমান ধানের থেকেও বেশি ফলনশীল হবে। কিন্তু এই ধরণের ধান জাতের সমস্যা এদের বীজ বেশিদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। চীনের বর্তমান আর্থসামাজিক ব্যবস্থার সাথে এইসব ধান সহায়ক হলেও বাংলাদেশের এই ক্ষেত্রে সমস্যা আছে। বাংলাদেশের চাষিদের বীজ ব্যবসায়ীদের মুখাপেক্ষী না হলেও চলে, কেননা দেশের মোট ব্যবহৃত ধান বীজের অন্তত ৮৫% চাষিরা নিজেরাই সংরক্ষণ ও ব্যবহার করে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট (Bangladesh Rice Research Institute, BRRI) এই পর্যন্ত High Yielding Variety (HYV) উদ্ভাবন করেছে সেগুলোর বীজ ধানক্ষেতেই উৎপাদন। করা যায়। শীঘ্রই হয়ত বাংলাদেশের চাষিরা অতি উচ্চ ফলনশীল দেশি ধান বীজ পাবে। বীজ ব্যবসায়ী কোম্পানি এই ধরনের বীজ বাংলাদেশে চালু করতে আগ্রহী। এই প্রেক্ষিতে সরকার পরীক্ষামূলক ভাবে সীমিত আকারে এ জাতীয় ধান উৎপাদনের অনুততি দিয়েছে এই শর্তে যে কোম্পানিগুলো দেশেই ধান বীজ উৎপাদন করবে।

পাঠ : বাংলাদেশ ভারত 

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সাথে আমাদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। কৃষির ক্ষেত্রে এই যোগাযোগ দুই দেশেরই ঐতিহ্যের অঙ্গ। দুটি দেশই জনসংখ্যাবহুল। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর ক্ষুধা নিবারণের গুরুভার কৃষক সমাজের উপর ন্যস্ত। ভারতের কৃষি বাংলাদেশের কৃষির তুলনায় অনেক উন্নত। ধান সহ বিভিন্ন শস্য, শাকসবজি, ভোজ্য তেলবীজ, তুলা, আখ, পোল্ট্রি, ডেইরি, মৎস প্রায় সব সকল কৃষিপণ্য উৎপাদনে ভারত বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে। ভারতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডেইরি সমবায়। একই ঐতিহ্য হয়েও ভারতের এই অগ্রগতির কারন ভারতের কৃষক বাংলাদেশের কৃষকদের চেয়ে অনেক সংগঠিত, এবং কৃষিবিজ্ঞান ও প্রকৌশলে ভারতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি। ভারতীয় বিজ্ঞানীরা শুধু ভারতে নয় বিশ্বকে কৃষিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের জলবায়ু যখন কৃষিকাজে বড় চ্যালেঞ্জ তখন ভারতের বৈচিত্র্যপূর্ণ জলবায়ুর কারনে সারাবছরই ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।।,

এতোকিছুর পরও উভয় দেশের প্রায় সকল ফলসের জমির ইউনিট প্রতি গড় উৎপাদন কাছাকাছি। পাট, চামড়া, ইলিশ ইত্যাদি কিছু পণ্য ছাড়া প্রায় সব কৃষি পণ্য ভারত থেকে বাংলাদেশে রপ্তানি হয়।

বাংলাদেশ ভিয়েতনাম 

বাংলাদেশের ও ভিয়েতনামের সবচেয়ে মিল ধান উৎপাদনে। তবে ভিয়েতনামের কৃষকদের অগ্রগতি বাংলাদেশের চেয়ে দ্রুত। পঁচিশ বছর আগেখও ভিয়েতনামের আৃষি দুর্বল ও অনগ্রসর ছিলো তারা বর্তমানে বাংলাদেশকে সকল ক্ষেত্রে ছাড়িয়ে গেছে। এর কারন হলো ভিয়েতনামের কৃষক সমাজ অত্যন্ত সংগঠিত। এবং সংগঠনগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী ও সৃজনশীল। এই সকল সংগঠন কৃষিনীতি ও কর্মপদ্ধতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কৃষিতে ভিয়েতনাত থেকে বেশ কিছু মাঠ প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে।

পাঠ: ফসলের মৌসুম নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠা

ফসলের ক্ষেত্রে মৌসুম নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠার প্রধান কারন হলো দিনের দৈর্ঘ্য সচেতনতা। এই দিবাদৈর্ঘ্য সংবেদনশীলতা দুর করতে বা কমিয়ে দিতে পারলে অর্থাৎ একটি মৌসুম নির্ভর ফসলকে মৌসুম নির্ভরতামুক্ত করতে পারলে ফসলটি যে কোনো মৌসুমে উৎপাদন করা যায়। 

উপযোগিতা

  • বাজারে অসময়ের ফল ও সবজির চাহিদা খুবই বেশি।  এসব অসময়ের ফসল উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। কৃষক ও খুচরা বিক্রেতা উভয়ে বাড়তি পয়সা উপার্জন করতে পারে।
  • বিশেষ করে আগাম ফসল বাজারজাত করতে পারলে বেশি দাম পাওয়া যায়।
  • ঋতুচক্র সংশিষ্ট কর্মহীনতা দুর করে কৃষকদের মোটামুটি সারাবছর কর্মব্যস্ত রাখতে পারে
  • একই কারনে গ্রামীণ কর্মশক্তিকে সারাবছর কাজের নিশ্চয়তা দিতে পারে।
  • মঙ্গা বা এই ধরনের সাময়িক দুর্ভিক্ষাবস্থা থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।
  • বাজারে কৃষিপণ্য বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করতে পারে।
  • পুষ্টি সমস্যার সমাধান সহজতর করতে পারে।
  • আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে এনে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হতে পারে।
  • বিদেশি ক্রেতাদের সারাবছর কৃষিপন্যের লভ্যতার নিশ্চয়তা দেওয়া যায়। ফলে কৃষিপণ্যের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো যায়।

কৃষি গবেষণাকে মৌসুম নির্ভরতা মুক্ত করা যায়।

ফসলের মৌসুম নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠার বিভিন্ন কৌশল

১. ফসল উৎপাদনের কৃত্রিম পরিবেশ সৃষ্টি : ফসলার জীবতা‌‌ত্ত্বিক গুণাগুণ পরিবর্তন না আরকেইনের এই কৌশলে যে কোনো ফসল উৎপাদন সম্ভব। এক্ষেত্রে উন্মুক্ত মাঠে ননা করে গ্রীন হাউসে কাঙ্ক্ষিত ফসল উৎপাদন করা হয়। 

এই পদ্ধতিতে  যে কোনো ফসল উৎপাদন হলেও উৎপাদন ব্যায় অনেক বেশি। তাই বিশেষ বিশেষ ফসল ছাড়া এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যায় না। এই কৌশলে বিপুল পরিমানে ফসল উৎপাদন করা যায় না। আমাদের দেশে পরীক্ষামূলক ভাবে এই পদ্ধতিতে ক্যাপসিকাম, স্ট্রবেরি ও টমেটো উৎপাদন করা হয়েছে। বর্তমানে এই ফসলগুলোর বাজার মুল্য অনেক বেশি। 

. ফসলের জেনেটিক বা বংশগতির পরিবর্তন : ফসলের মৌসুম নির্ভরতা কাটিয়ে তুলতে এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচের পদ্ধতি হলো বংশগতিতে পরিবর্তন আনা। ফসলের জিনগত পরিবর্তন, ফসলের দিবাদৈর্ঘ্য সংবেদনশীলতার জন্য দায়ী জিন ছাটাই করা অথবা এমন পরিবর্তন আনা যাতে তা প্রশমিত থাকে। এই ধরনের ফসলকে জিএম ফসল বা জেনেটিকালি মডিফাইড ক্রপ বলে। এই বিশেষ কৌশলকে বায়োটেকনোলজি বলে।

. অভিজ্ঞ কৃষকদের পর্যবেক্ষণ, চয়ন, ও নিরীক্ষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েও মৌসুম নির্ভরতা এড়াতে সক্ষম এমন ফসল উদ্ভাবন করা যেতে পারে। মাঠপর্যায়ে টিকে গেলে এগুলোকে নতুন জাত হিসাবে স্বীকৃতি পায়। কৃষক পর্যায়ে আবিষ্কৃত এইসব আগাম জাত, নাবি জাত মাঠ পর্যায়ে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ফলে জনপ্রিয় কোনো কৃষিপণ্য বাজারে দীর্ঘসময় ধরে পাওয়া যায়। এই সকল কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যায় খুব বেশি না হওয়ায় কৃষকের মুনাফা বৃদ্ধিতে ভুমিকা রাখে। ফসলের জাত উদ্ভাবনে  মানবসৃষ্ট এটিই সবচেয়ে সনাতন পদ্ধতি। 

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *