অধ্যায়ঃ ৩ – কৃষি উপকরণ

JSC / কৃষি শিক্ষা

অধ্যায়ঃ ৩ – কৃষি উপকরণ

কৃষি প্রথম শর্ত হলো কৃষি উপকরণ। উন্নত কৃষি উপকরণই লাভজনক ফলন ও অধিক উৎপাদন আয় নিশ্চিত করতে পারে৷ এই অধ্যায়ে কৃষি ও কৃষি উপকরণ নিয়ে আলোচনা করা হবে। 

এ অধ্যায় শেষে আমরা –

  • বীজ বপনের জন্য উপযুক্ত মাটি প্রস্তুত করতে পারব 
  • একটি আদর্শ বীজতলা তৈরির কৌশল জানব
  • একটি আদর্শ বীজতলার রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাখ্যা করতে পারব
  • জমিতে সাশ্রয়ীরূপে সার ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করতে পারব 
  • জমিতে সাশ্রয়ীরূপে সেচ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করতে পারব 
  • উচ্চ ফলনের সাথে ভালো বীজ নির্বাচন ও সংরক্ষণের সম্পর্ক স্থাপন করতে পারব 

পাঠ -১: নার্সারিতে বীজ বপনে উপযুক্ত মাটি প্রস্তুত 

বীজতলায় বীজ বপন করে চারা উৎপাদন হয়।  তাই উন্নত বীজের জন্য বীজতলার মটি ভালোভাবে প্রস্তুতি জরুরি ।  

বীজতলার মাটি প্রস্তুত করতে প্রয়োজনীয় উপকরণ হলো

  • জমি 
  • খুঁটি 
  • জায়গা মাপার ফিতা 
  • কোদাল 
  • জৈব ও অজৈব সার

আমাদের দেশে সাধারণত দুই ভাবে বীজতলা  প্রস্তুত হয়। 

ক) শুকনো       খ) ভেজা

শুকনো বীজতলায় সরাসরি বীজ বপন করা যাবে । তবে ভেজা বীজতলার ক্ষেত্রে মাটি পানি দিয়ে ভিজিয়ে কাদা করে সমান করতে হবে৷ অতঃপর বীজ বপন করতে হবে। মাটি প্রস্তুতির নিয়মগুলো হলো –

  • বীজতলার চারপাশে ৩০সে.মি. চওড়া ও ১৫ সে.মি. গভীর নালা তৈরি করতে হবে
  • বীজতলার মাটি ২০-২৫ সে.মি. উঁচু রাখতে হবে
  • ১৫-২০ সে.মি. গভীর করে বীজতলার মাটি চাষ করতে হবে 
  • এ অবস্থায় মাটি ২-৪ দিন রেখে দিলে মাটিতে রোদ লাগবে, পোকা বের হলে পাখি খেয়ে ফেলবে 
  • এরপর ঘাস, শিকড়, পাথর, ইত্যাদি বেছে ফেলে দিতে হবে 
  • মাটি এঁটেল হলে অন্য জায়গা থেকে দোআঁশ মাটি এনে বীজতলায় মেশাতে হবে, কিন্তু মাটি বেলে হলে জৈব পর্দাথ ও দোআঁশ বা এঁটেল মাটি যোগ করতে হবে।
  • বৃষ্টির পানি বা বাতাসে মাটি সরে যেতে পারে সেজন্য চারপাশে ছিদ্র করা ইট বা অন্য কিছু দিয়ে ঘিরে দিলে ভালো হয় 
  • বীজতলায় দলা বা ঢেলা ভেঙে ঝুরঝুরা করে মাটি সমান করতে হবে 
  • বীজ বপনের ১০-১২ দিন আগে বীজ তলায় টিএসপি, এমওপি পচা শুকানো গোবর বা আর্বজনা সার মিশিয়ে দিতে হবে
  • নার্সারির আকার অনুযায়ী সার প্রয়োগ করতে হবে 
  • মাটি শোধনের জন্য গ্যামাক্সিন বা ফরমালডিহাইড জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করা যেতে পারে 

পলিব্যাগে ভরার জন্য মাটি : উপরোক্ত নিয়মে প্রস্তুতকৃত মাটি চালনি দ্বারা চেলে ঢেলামুক্ত করতে হবে। 

পাঠ : আর্দশ বীজতলা তৈরি 

) ধান ফসলের বীজতলা : বীজতলায় বীজ বপন করে চারা উৎপাদন করা হয় এবং রোপনের আগ পর্যন্ত চারার যত্ন নেওয়া হয়। তাই আর্দশ বীজতলা তৈরির জন্য জমি চাষ ও মই দিতে হয়। সাধারণত বীজতলা ২ ভাবে তৈরি করা হয়। যথা – ভেজা কাদাময় বীজতলা ও শুকনো বীজতলা  

আর্দশ বীজতলার গঠন (ধান ফসল)  

১) প্রতিটি বীজতলার আকারে হবে ৯.৫×১.৫মিটার এবং খুঁটি দিয়ে তা চিহ্নিত করতে হবে 

২) দুটো বীজতলার মাঝে ৫০সে.মি. ও বীজতলার চারপাশে ২৫ সে.মি. পরিমাণ জায়গা নালা তৈরি করার জন্য রাখতে 

৩) দুটো বীজতলার মাঝের ও চারপাশে জায়গা থেকে মাটি তুলে বীজতলা ৭-১০ সে.মি. উঁচু করতে হবে। 

৪) বীজতলার প্রতি বর্গমিটার ২ কেজি হারে গোবর বা কম্পোস্ট সার প্রয়োগ করে বীজতলার সাথে মেশাতে হবে ;

) উদ্যান ফসলের বীজতলা : নার্সারি উদ্যান ফসলের বীজ /চারা/স্টাম্পস বপন বা রোপন করে মুল জমিতে রোপনের উপযোগী করে তোলে৷ 

আর্দশ বীজতলার গঠন ( উদ্যান ফসল

) বেড তৈরির জন্য উঁচু, আলো-বাতাস সম্পূর্ণ, উর্বর জমি নির্বাচন করা লাগবে। 

) প্রতিটি বেডের আকার হতে হবে ৩×১ মিটার এবং খুটি দিয়ে তা চিহ্নিত করতে হবে। 

) কোদাল দিয়ে ভালোভাবে কুপিয়ে বেড করতে হবে 

) প্রতি বেডে ২৫ কেজি গোবর মেশাতে হবে 

) পাশাপাশি দুটি বেডের সাথে ৫০ সে.মি. নালা তৈরি করতে হবে 

) নালার পাশাপাশি দুটি বেড ভাগ করে দিতে হবে 

) এরপর প্রতি ৩ বর্গমিটার বেডের জন্য ১৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০০ গ্রাম টিএসপি, ১০০ গ্রাম এমওপি সার ছিটিয়ে মেশাতে হবে 

) মাটি অধিক অম্লীয় হলে বেড ১৫০ গ্রাম চুন প্রয়োগ করতে হবে৷ 

) রশি, খুটি সরিয়ে বেডের উপর সমানভাবে বীজ বপন করতে হবে। 

পাঠ-৩: বীজতলা রক্ষণাবেক্ষণ 

  • বীজতলার মাটি সমান রাখতে হবে 
  • বীজতলার আগাছা পরিষ্কার রাখতে হবে 
  • বীজতলায় পোকামাকড় ও  রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দমনের ব্যবস্থা করতে হবে 
  • বেডের মাঝে নালায় সবসময়ই পানি রাখার জন্য সেচের ব্যবস্থা করতে হবে 
  • বীজতলায় কখনো কাঁচা গোবর প্রয়োগ করতে নেই 
  • পশুপাখির আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে চারপাশে বেড়ার ব্যবস্থা করতে হবে 
  • বীজতলা যাতে শুকিয়ে না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। 

পাঠ-৪ : জমিতে সার প্রয়োগ 

সার প্রয়োগ করতে আগে মাটি পরীক্ষা করে নেয়া উত্তম। মাটি পরীক্ষা না করে সার প্রয়োগ করলে –

  •  একদিকে যেমন উৎপাদন কম হয় অন্যদিকে খরচ বাড়ে 
  • মাটির উর্বরতা কমে 
  • পরিবেশ নষ্ট হয়

আবার, সুষম সার প্রয়োগে – 

  • মাটিতে পুষ্টি উপাদান যোগ হয় 
  • মাটি উর্বর হয় 

মাটিতে সার প্রয়োগপর আগে করনীয় 

  • পরীক্ষা করে মাটির গুণাগুণ জানতে হবে  
  • পরীক্ষিত মাটিতে কোন ফসল চাষ উপযোগী তা জানতে হবে 
  • ফসলভিত্তিক সারের চাহিদা কৃষি কর্মকর্তার কাছে থেকে জেনে নিতে হবে 
  • ঐ জমির পূর্ববর্তী চাষের ইতিহাস জানতে হবে৷ 

পাঠ-৫ : সার ব্যবহারে সাশ্রয় 

  • ইউরিয়া জাতীয় সার মাটিতে অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী এবং মৌসুম শেষে মাটিতে তা একদমই থাকেনা। তাই চাহিদা মতো ব্যবহার করে সাশ্রয় করা যায় 
  • জমিতে সবুজ সার তৈরির পর ধানের জমিতে নাইট্রোজেন সারের মাত্রা ১৫-২০ কেজি / হেক্টর কমানো যাবে৷ 
  • এলসিসি LCC ( Leaf Color Chart.)  ব্যবহারের মাধ্যমে ইউরিয়া ব্যবহার ফসলের ফলন ঠিক রাখে ও ২৩ ভাগ ইউরিয়া কম লাগে 
  • গুটি ইউরিয়া ব্যবহার সহজ না হলেও এতে ২৫% ইউরিয়া সাশ্রয় হয় 

সাশ্রয়ীরুপে সার প্রয়োগপর পদ্ধতি 

  • রাসায়নিক সার কেনো বীজ, গাছের কান্ডের খুব কাছে বা ভেজা কচিপাতার উপর ব্যবহার করা যাবে না 
  • ধানের কাদাময় জমিতে ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হবে 
  • জৈব সার, টিএসপি ও এমওপি সার বীজ বপন বা চারা রোপনের আগে প্রয়োগ করতে হবে
  • ধানের চারার প্রথম কুশি বের হওয়ার সময় কচি থোড় জন্মের কয়েকদিন আগে এবং গমে মুকুট শিকড় বের হলে, ভুট্টার চারা যখন হাঁটু সমান হয় এবং স্ত্রী ফুল বের হওয়ার এক সপ্তাহ আগে সার প্রয়োগ করা দরকার 
  • বোরো ধানের বেলায় ০.৯ গ্রাম ওজনের ৩টি এবং আমান ও আউশের ক্ষেত্রে ২টি গুটি ইউরিয়া পুঁততে হয় 
  • জমি তৈরির শেষ পটাশ, গন্ধক ও দস্তা জাতীয় সারগুলো প্রাথমিক ভাবে একবার প্রয়েগ করা যাবে। 

পাঠ : জমিতে সাশ্রয়ীরূপে সেচের ব্যবহার 

ফসল উৎপাদনে কৃত্রিম ভাবে পানি দেওয়ার পদ্ধতিকে সেচ পদ্ধতি বলে৷ সেচের জন্য অবস্থান অনুসারে পানির উৎস দুই প্রকার। 

  • ভূ-উপরিস্থ পানি, যেমন- নদ-নদী, খাল-বিল ইত্যাদির পানি 
  • ভূ-গর্ভস্থ পানি, যেমন – গভূর নলকূপ, অগভীর নলকূপ, শক্তিচালিত পাম্প, ভাসমান পাম্প ইত্যাদি। 

জমিতে সাশ্রয়ীরূপে সেচের ব্যবহার এর জন্য নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে – 

) সেচ নালার ধরন : সেচ নালার মাধ্যমে জমিতে সেচের পানি পরিবহন করা হয়৷  

) সেচ পদ্ধতি : ফসলের প্রকার, ভূমির বন্ধুরতা,মাটির প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের সেচ পদ্ধতি রয়েছে  

  • চেক বেসিন পদ্ধতি 
  • রিং বেসিং পদ্ধতি 
  • নালা পদ্ধতি 
  • বর্ষণ সেচ পদ্ধতি 
  • ড্রিপ সেচ পদ্ধতি 

) সেচের পানির পরিমাণ : সেচের ক্ষেত্রে পানির পরিমাণ এর দিকে নজর রাখতে হবে নাহয় উদ্ভিদের বিভিন্ন রোগ হতে পারে  

) সেচের সময় : সঠিক সময়ে সেচ দেওয়ার বেলায় দুটি বিষয় বিবেচনায় আনতে হবে – 

  • মাটির রসের অবস্থা 
  • ফসলের বৃদ্ধি পর্যায়

বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধান। দেশের মোট জমির ৭৫% জমিতে ধান হয়। বোরো মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ধান উৎপন্ন হয়৷ বর্তমানে চাষের সময় পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমিক ভেজানো ও শুকনো ( Alternative Wetting and Drying ) পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়েছে। এ পদ্ধতি অবলম্বনে সবসময়ই জমিতে দাঁড়ানো পানির প্রয়োজন নেই। জমিতে একটি পর্যবেক্ষণ নল স্থাপন করে সেচের সময় নির্ধারণ করা হয়৷ এ পদ্ধতি লাভজনক ও সাশ্রয়ী। 

পাঠ : ভালো উন্নত বীজ নির্বাচন 

ভালো ফলনের মুল রহস্য হলো উন্নত বীজ। পরিপক্ক নিষিক্ত ডিম্বককে  উদ্ভিদ বিজ্ঞানে ( Matured Fertilized Ovule) বীজ বলে৷ উদ্ভিদের অন্যান্য অঙ্গ ব্যবহার করেও বংশ বিস্তার সম্ভব। 

চাষি পর্যায়ে উন্নত বীজ নির্বাচনের আগে আরও কিছু বিষয় বিবেচনা নিতে হবে,যেমন –

  • চাষির কৃষি পরিবেশ অঞ্চলের জন্য ফসলের কোন কোন জাত উপযুক্ত 
  • ঐ জাতগুলির মধ্যে কোনটি কম সময়ে উৎপাদন সম্ভব 
  • জাতগুলোর মধ্যে কোনটি কম খরচে অধিক ফসল দিবে 
  • কোন জাতটির রোগ বালাই কম হয় 
  • কোন জাতটি মাঠ পরিচর্যা সহজতর

ভালো বীজের আরও কিছু ভালো গুণ থাকা দরকার। যেমন – 

  • মিশ্রণহীন বীজ 
  • অন্তত ৮০% অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা সম্পন্ন 
  • চারার উচ্চমানের সতেজতা 
  • পরিচ্ছন্নতা 
  • সুস্থ বীজ 

সহজাতের ও বিশ্বাসযোগ্য পরীক্ষার মাধ্যমে বীজের উল্লিখিত গুণাগুণ আছে কিনা নির্ধারণ করা যায়। 

পাঠ : বীজ সংরক্ষণ 

সঠিকভাবে বীজ সংরক্ষণ করলে বীজের গুণাবলি অক্ষুণ্ণ থাকে। 

উন্নত বীজ সংরক্ষণ কৌশল : বীজ ফসল (seed crop) নির্বাচন মাঠ থেকে শুরু করতে হয়৷ বীজ ফসল মাঠে থাকতেই সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিতে হবে। যাতে বীজ ফসল রোগ সংক্রমণ না হয় এবং অন্য কোনো বালাই না হয়। 

গুদামজাত বীজ কতটা এবং কতসময় ভালো থাকবে তার উপর আর্দ্রতা নিয়ামক হিসাবে প্রভাব রাখে৷ 

আর্দ্রতা ছাড়া যে সকল প্রভাবক বীজের ক্ষতি করতে পারে সেগুলো হলো

  • উচ্চতাপ 
  • তীব্র রশ্মি 

পাঠ-৯ : ধানবীজ সংরক্ষণের ধাপ 

  • বীজের জন্য ধান পৃথককরণ করে বিশেষ পরিচর্যায় জন্য উৎপাদন করা ভালো  
  • ধান পাকা মাত্রই তা কম খড়সহ যত্নের সাথে শুকাতে দিতে হবে এবং সম্ভব হলে ওইদিনই মাড়াই ঝাড়াই শুরু করতে হবে 
  • বীজ ধান ঠিকমতো শুকানো হলো কি না দাঁতে কেটে পরীক্ষা করতে হবে 
  • বীজপাত্রে সংরক্ষণের আগে ছায়াযুক্ত স্থানে কিছুক্ষণ রাখতে হবে। 
  • বীজপাত্র পূর্ণ করে বীজ রাখা ভালো 
  • বীজপাত্রের গায়ে বীজের পরিচয়, পাত্রস্থ করার তারিখ, কোনো রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহার হয়েছে কিনা এইসব লিখতে হবে 

মরিচের বীজ সংরক্ষণের ধাপ 

  • সুস্থ, সবল, গাছ থেকে সতেজ রোগমুক্ত মরচ সংরক্ষণ করতে হবে 
  • সতেজতা থাকতেই মরিচগুলো ভেঙে পরিষ্কার পাত্রে সাবধানে বীজ বের করতে হবে 
  • সংগ্রহ করা বীজগুলোর মধ্যে অপুষ্ট, রোগ লক্ষণযুক্ত অস্বাভাবিক বীজ থাকলে তা বাছাই করে ফেলে দিতে হবে। 
  • শুকনোর পর পাত্রে রাখার আগে বীজ ঠান্ডা করে নিতে হবে 
  • বীজের প্যাকেটগুলাতে লেবেল লাগাতে হবে। 

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *