অধ্যায়ঃ ৪ – কৃষি ও জলবায়ু

JSC / কৃষি শিক্ষা

অধ্যায়ঃ ৪ – কৃষি ও জলবায়ু

কৃষির সাথে জলবায়ুর সম্পর্কে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে আছে। কৃষি ও জলবায়ুর মধ্যে সেতুবন্ধনই এই অধ্যায়ের আলোচনার বিষয়। 

অধ্যায় শেষে আমরা – 

  • প্রতিকূল পরিবেশে কৃষিজ উৎপাদনের কৌশল বর্ণনা করতে পারব 
  • বিরূপ আবহাওয়া থেকে কৃষি উৎপাদনকে  রক্ষায় কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের কৌশল বিশ্লেষণ করতে পারবো 

পাঠ ১: ফসল উৎপাদনে প্রতিকূল পরিবেশ 

প্রতিকূল পরিবেশ ও ফসলের ফলনের মধ্যে ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এইসব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ও ফসলের বেড় উঠার ব্যাপারকে ফসলের অভিযোজন ক্ষমতা বলে। 

প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টিকারী জলবায়ুগত উপাদান গুলো হলো –

  • বন্যা বা জলাবদ্ধতা 
  • অনাবৃষ্টি 
  • উচ্চ তাপ 
  • নিম্ন তাপ 

আর পরিবেশগত উপাদানের মধ্যে রয়েছে –

  • মাটির লবণাক্ততা 
  • মাটিতে বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি 
  • মাটিতে বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি 

বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিকূলতা সবসময়ই ছিলো। বর্তমানে বৈশ্বিক ভাবেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। 

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের কৃষি খাতে ৩টি আশঙ্কা জনক ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে –

  • খরা 
  • লবণাক্ততা 
  • বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় 

পাঠ ২: খরা অবস্থায় ফসল উৎপাদন কৌশল 

খরা বর্তমানে প্রাকৃতিক বিপত্তির গুলোর অন্যতম  খরার কারণপ ফসলের ১৫-৯০ ভাগ ফসল হ্রাস পেতে পারে৷ খরা মোকাবেলায় বা খরা কবলিত এলাকায় ফসল উৎপাদনে নিম্নোক্ত কৌশলগুলো অবলম্বন করা যেতে পারে 

  • উপযুক্ত ফসল বা ফসলের জাত ব্যবহার  
  • মাটির ছিদ্র নষ্টকরণ
  • অগভীর চাষ 
  • জাবড়া প্রয়োগ 
  • পানি ধরা 
  • আঁচড়ানো 
  • সারির দিক পরিবর্তন 
  • জৈব সার ব্যবহার 

পাঠ ৩: লবণাক্ত অঞ্চলে ফসল উৎপাদন কৌশল 

নিচে লবণাক্ত মাটিতে ফসল উৎপাদন কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। 

১. লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসলের চাষ : নারিকেল, সুপারি, সুগার বিট, তুলা, শালগম, ধইঞ্চা, পালংশাক ইত্যাদি উত্তম লবনাক্ততা সহিষ্ণু ফসল। ঠিক তেমন, আমড়া, মিষ্টি আলু, মরিচ,বরবটি, মুগ, খেসারি, ভুট্টা, টমেটো, পেয়ারা ইত্যাদি মধ্যম লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসল। এইভাবে লবণাক্ততা সহিষ্ণুতার উপর ভিত্তি করে ফসল নির্বাচন করতে হবে। 

২. সেচ ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা : জমির চারপাশে  আইল দিয়ে ভারী সেচ দিলে মাটির দ্রবণীয় লবণ চুইয়ে মূলাঞ্চলে চলে যায়। তাই সঠিক সেচ ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা লাগবে। 

৩. পানির বাষ্পীভবন হ্রাসকরণ : পানির বাষ্পীভবন হ্রাসকরণ করা না গেলে জমিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ে। তাই এ বিষয়ে বিবেচনা করা উচিত।

৪. সঠিকভাবে জমি তৈরি : জমির উপর ভিত্তি করে উৎপাদন খরচ ও উৎপাদন আয় বাড়ে কমে। তাই সঠিকভাবে জমি তৈরি ভালো ফলনের পূর্বশর্ত। 

৫. বপন পদ্ধতির পরিবর্তন : লবণাক্ত জমিতে বীজ ঋিটালে লবণ তাড়াতাড়ি উপরে আসে ও বীজ কৃ গজায়। বপন পদ্ধতির পরিবর্তন ও পরিমাণ মতো সেচ দিয়ে ভালো ফলন নিশ্চিত করা যায়। 

পাঠ ৪: বন্যাপ্রণব অঞ্চলে ফসল উৎপাদন কৌশল 

বাংলাদেশে প্রতিবছরই বন্যা হয়। ১৯৯৮ সালে এ দেশে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হয়। যাতে ৩ লক্ষ মেট্রিক টন ধান নষ্ট হয়ে যায় । বন্যার সময় পানির উচ্চতার উপর ভিত্তি করে বন্যাপ্রবণ জমিকে চার ভাগে ভাগ করা হয়  যেমন –

  • মধ্যম উঁচু জমি : বন্যার সময় পানির উচ্চতা সর্বোচ্চ ০.৯০ মিটার পর্যন্ত হয় 
  • মধ্যম নিচু জমি : বন্যার সময় পানির উচ্চতা সর্বোচ্চ ১.৮০ মিটার পর্যন্ত হয় 
  • নিচু জমি : বন্যার সময় পানির উচ্চতা সর্বোচ্চ ৩.০০ মিটার পর্যন্ত হয় 
  • অতি নিচু জমি : বন্যার সময় পানির উচ্চতা সর্বোচ্চ ৩.০০ মিটার এর বেশি হয় 

এসব বন্যাপ্রবণ জমিতে মৌসুম ও এলাকাভিত্তিক বোনা আমন, গভীর পানির আমন, রোপা আমন, বোনা আউশ, রোপা আউশ, বোরো ধান চাষ হয়৷ 

এসব এলাকায় ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রধানত ২ ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়, যেমন –

  • বন্যা নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা : এসব এলাকায় বন্যানিয়ন্ত্রনের জন্য নদী, বা খালের দুই তীরে দিয়ে বাঁধ দেওয়া। সুইস গইট নির্মাণ করে নদী বা খালে পানি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। 
  • কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থা : বন্যার সম্ভাব্য সময় ও বন্যা চলাকালীন সময়ে সঠিক ধান নির্বাচন করে সঠিক সময়ে বপন বন্যায় ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সীমিত করে আনতে পারে। তাই  সমন্বিত ব্যবস্থা নিলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমানো সম্ভব। 

পাঠ ৫: প্রতিকূল পরিবেশে পশুপাখি উৎপাদন 

পশুপাখির উপর প্রতিকূল পরিবেশের প্রভাব দেয়া হলো –

  • পশুপাখির খাদ্যাভাব দেখা যায় 
  • বিশেষ করে বন্যা ও খরার সময় ঘাসের অভাব দেখা দেয় 
  • লবণাক্ত জমিতে ফসল ও ঘাস জন্মায় না 
  • পশুর বৃদ্ধি ও দুধ উৎপাদন অনেক কমে যায় 
  • পশু পুষ্টিহীনতায় ভোগে 
  • অনেক পশুপাখি রোগে আক্রান্ত হয় 

বন্যার সময় করনীয় 

  • কোনো উঁচুস্থানে অবস্থান 
  • লেয়ার মুরগীর খামার না করে ব্রয়লার মুরগীর খামার করা 
  • পশুর ঘরে যেন কাদামাটি না ঢুকে সেদিকে লক্ষ্য রাখা 
  • বন্যার আগেই পশুকে সম্ভাব্য রোগের টিকা দেয়া  

খরার সময় করনীয় :

  • ঘাসের পরিমাণ কম থাকায় সুবিধা মতো গাছপর পাতা খাওয়াতে হবে  
  • অতি গরমে পশুকে বেধে না রাখা উত্তম 
  • পশুকে ছায়াযুক্ত স্থানে রাখতে হবে 
  • ডাক্তারের পরামর্শ মতো টিকা দেয়া যাবে 
  • বিভিন্ন ঘাস চাষ করে খাওয়ানো যেতে পারে 

পাঠ ৬: প্রতিকূল পরিবেশে মৎস উৎপাদন ও বিরূপ আবহাওয়ায় মৎস রক্ষার কৌশল 

বাংলাদেশের এমন কিছু অঞ্চল আছে যেখানে সারাবছরই কিছু না কিছু হতে থাকে। 

বন্যা প্রবণ এলাকা মাছ চাষের জন্য উপযোগী নয় । এতে পুকুর ডুবে নাছ ভেসে যাওয়ার ভয় থাকে৷ 

প্রতিকূল পরিবেশে মৎস উৎপাদন ও বিরূপ আবহাওয়ায় মৎস রক্ষার জন্য নিম্নোক্ত ব্যবস্থা অবলম্বন করা যেতে পারে –

  • খরাপ্রবণ এলাকায় বড় পোনা ছাড়া যেতে পারে যাতে অল্প সময়ে ফলন পাওয়া যায় ।
  • বন্যাপ্রবণ এলাকায় একই পুকুরে একটি দীর্ঘ ও একটি স্বল্পমেয়াদী মাছ চাষ পদ্ধতি নেওয়া যায়। 
  • উপকূলবর্তী অঞ্চলে লবণাক্ততা সহনশীল চাষযোগ্য মাছের পোনা উৎপাদন ও চাষের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে 
  • প্রতিকূল পরিবেশ ও বিরূপ আবহাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলে বাঁধ ভেঙে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। 
  • অতিবৃষ্টির কারণে পুকুর ভাসায় আশঙ্কা থাকলে ওাড় বরাবর চারপাশে বাঁশের খুটির সাহায্যে জাল দিয়ে আটকে দিতে হবে 
  • গ্রীষ্মের সময় পুকুরের পানির উচ্চতা কমে গেলে ও তাপমাত্রা বৃষ্টি পেলে সেচ বা পাম্পের ব্যবস্থা করতে হবে 

পাঠ ৭: বিরূপ আবহাওয়ায় ফসল রক্ষার কৌশল 

অধ্যায় এর শুরুতে প্রতিকূল পরিবেশ সম্পর্কে জেনেছি। 

বিরূপ আবহাওয়া এবং সে আবহাওয়ায় ফসল রক্ষার কৌশলে নিচে বর্ণনা করা হলো –

১. জলাবদ্ধতা : জলাবদ্ধতার সময় পানি নিষ্কাশনের দিকটায় নজর দিতে। ফসলের মাঠ বা জমিতে পানির আটকে থাকা বন্ধ করতে হবে। এইজন্য নালা কেটে পানি বের করে দিতে হবে।  অথবা প্রতিকার হিসেবে আগেই বাঁধ নির্মাণ করা যায়। 

২. অতিবৃষ্টি : অতিবৃষ্টি ফসলের জন্য ক্ষতিকর।তাই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সীমিত করে আনতে আগে নালা খনন দরকার। 

৩. অনাবৃষ্টি : অনাবৃষ্টিতে সেচের মাধ্যমে জমির জো ঠক রেখে চাষাবাদ করতে হবে। 

৪. শিলাবৃষ্টি : বছরের মার্চ এপ্রিল মাসে শিলাবৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হলেও বৃষ্টি শেষে ক্ষতিগ্রস্ত গাছের ডালপালা ছেটে দিলে ক্ষতির মাত্রা সামান্য কমানো যায়। 

পাঠ : বিরূপ আবহাওয়ায় পশুপাখি রক্ষার কৌশল 

বিরূপ আবহাওয়ায় পশুপাখির উপর প্রভাব দেওয়া হলো –

  • বিরূপ আবহাওয়ায় পশুর অভিযোজন হতে সময় লাগে৷ 
  • পশুপাখির খাদ্যের অভাব দেখা দেয় 
  • বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয় 
  • জীবিত পশুপাখির দুধ,মাংস ও ডিম উৎপাদন কমে যায়
  • অনেক পশুপাখি মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে 

আবহাওয়ার উপর কারও নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই ক্ষতির মাত্রা ও বেশি থাকে 

বর্তমানে আবহাওয়াবিদরা আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়ে থাকেন। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিলে অর্থাৎ জরুরি পদক্ষেপগুলে সঠিক সময়ে গ্রহণ করলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমে আসে৷ প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে৷ প্রয়োজনীয় খাবার সংরক্ষণ করে এইসময় সরবরাহ করতে হবে৷এভাবে প্রতিকূলতার সাথে মোকাবিলা করে বৈচিত্র্য মৌসুমে টিকে থাকতে হবে।

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *