ঢাবিয়ানের বাস্তব জীবনের গল্প

Motivation

ঢাবিয়ানের বাস্তব জীবনের গল্প

কেমন আছো সবাই? 

এডমিশনের চিন্তা নিয়ে নিশ্চয়ই অনেক খারাপ সময় কেটে যাচ্ছে। আমাদেরও কেটেছিল। তাই তোমাদের জন্য একটুখানি মোটিভেশন নিয়ে আসলাম। 

আচ্ছা চলো একজন ঢাবিয়ানের বাস্তব জীবনের গল্প শুনি –

” ২০১৬ সাল।তখন আমার পরিবারে একদম টানাটানি অবস্থা। একদিকে যেমন আর্থিক অনটন অন্যদিকে বাবা অসুস্থ। আমি বড়। আমাকে হেল্প করার মতোও কেউ নাই। ফ্যামিলির টেনশনে, চোখের সামনে এসব দেখতে দেখতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো মানে দেখছিলাম না। সুইসাইড করার প্লান করলাম। আর এসব ভালোলাগে না। রুমের দরজা দিয়ে অনেক কত যে কেঁদেছি,তার হিসেব আমি নিজেও জানি না। তারপর এস এস সি রেজাল্ট হলো খারাপ। ৪.৬৭ পেলাম।

 আরো একটা ধাক্কা। আমাকে আর পড়াবে না। এসব নিয়েই মোটামুটি সুইসাইডই ছিল আমার লক্ষ্য। কিন্তু পরে মনে হলো কেন এভাবে নিজেকে শেষ করে দেব। নিজের জীবন নিজেকেই গড়তে হবে। আমি বুঝতে পারি বাসায় থাকলে আমার পড়ালেখা হবে না। এক প্রকার পালিয়ে চলে আসি ঢাকায়। স্থির করি একটা জব করে রাতে পড়াশোনা চালিয়ে নেব। কিন্তু আমার কলেজ ভর্তির টাকা কে দেবে?  বাসায় ফোন দিলাম। অনেক অনুরোধ করলাম। তারা আমাকে ব্যাংক লোন নিয়ে ভর্তির টাকা দিল। ভর্তি হলাম মানবিক বিভাগে কারন সাইন্সে পড়তে গেলে প্রাইভেট পড়তে হবে। অনেক টাকার ব্যাপার। কিছু টাকা বাকি রেখেছিলাম। 

এখন মেস ভাড়া নাই আমার কাছে। বাসার ম্যানেজার সারাদিন টাকার জন্য চিল্লাচিল্লি করতো। কিন্তু আমার কিছুই করার ছিল না। দিনরাত একটা টিউশন খুজতাম। রাতের অন্ধকারে একা একা লিফলেট লাগিয়ে বেরিয়েছি অচেনা এ শহরে।পা ব্যাথা হয়ে গিয়েছিল। না খেয়ে থেকেছি কত। আমার কাছে তখন খাওয়াটা অস্বাভাবিক এবং না খাওয়াটা স্বাভাবিক মনে হয়েছিল।  যাক,পরে একটা টিউশন পাই। ওটা দিয়ে কিছুদিন অনেক কষ্টে চললাম। তারপর, প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলাম। ভাবলাম এবার স্যারকে বলে বেতন মওকুফ করে নেব।স্যারের দরজায় অনেক ঘুরেছি,অনুমতি পাইনি। রাগে, ক্ষোভে টিসি নেয়ার আবেদন নিয়ে স্যারের দরজার সামনে কেঁদেছি। এই বুঝি আমার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। কারণ,বেতন মওকুফ না করলে আমার পড়াশোনা সেখানেই বন্ধ হয়ে যেত।

যাক পড়ে আমার এক ম্যাম ও স্যার বিষয়টা লক্ষ্য করে এবং আমি তাদের সব খুলে বলি। তারা আমাকে প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে নিল। স্যার অনেক ইন্সপায়ার করে আমার সকল বেতন মওকুফ করে দিল। 

প্রথম বর্ষের ফাইনাল রেজাল্ট দিল, আবারো ভালো করলাম। তবে এসময় আমার ভাগ্য অনেক প্রসন্ন ছিল। খুলনায় বাসা, এক অ্যান্টি আমাকে তার বাসায় থাকার ব্যাবস্থা করতে রাজি হয়ে গেল। তবে শর্ত হচ্ছে যে,তার ছেলেকে পড়াতে হবে। আমি রাজি হয়ে গেলাম। ভর্তি পরীক্ষার আগ পর্যন্ত সেই অ্যান্টির বাসায় ছিলাম। তখন, আমার হাত খরচ চালানোর জন্য টিউশন  করতে হতো। টিউশন তারপর আবার বাসায় পড়ানো। তারপর আবার নিজের পড়াশোনা। সব মিলিয়ে আমার উপর অনেক ধকল গিয়েছে। মাঝে মাঝে যখন আর সইতে পারতাম না। তখন ভাবতাম জীবনের আসল মজা তো এখানেই। এমনকি আমি এইচ এস এসি এক্সাম দিয়ে এসেও টিউশন এ যেতাম। যাক,রেজাল্ট বের হলো – জি পি এ ৫। আমার কলেজ থেকে আমি একাই মানবিক বিভাগে জিপিএ ৫ পেলাম। পরে ঢাকা বোর্ড ১৫তম হয়েছিলাম। আমার চোখ দিয়ে অজান্তেই পানি পড়তে লাগলো। আমি মনে হয় স্বপ্ন দেখতে শিখে গেছি। 

এখন স্বপ্ন ঢাবি। আমার কাছে অন্য কোথাও আবেদন করার মতো টাকাও ছিল না। তাই শুধু ঢাবিতেই করেছিলাম।সারাদিন অনেক পরিশ্রমেরও পড়াশোনা ছাড়িনি। বাসে বসে জ্যামে পড়তাম,টিউশন এ গিয়ে ছাত্রকে পড়া দিয়ে আমিও পড়তাম,যা যা পড়ব তার একটা নোট থাকতো আমার কাছে। বাসায় রেস্ট নেয়ার বদলেও পড়তাম। প্রচুর জেদ ছিল, ঢাবি আমাকে পেতেই হবে। পরীক্ষার আগে নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া চাইলাম। সেইবার প্রশ্ন অনেক কঠিন হয়েছিল, মনে অনেক সন্দেহ ছিল। যেদিন রেজাল্ট দিবে, মনে আছে আমি জায়নামাজে বসে তাসবি গুনতে ছিলাম। আরেকটু পরেই আমার ভবিষ্যৎ ঘোষণা হবে। লগ ইন করলাম। হাত পা কাপছিল। আলহামদুলিল্লাহ ১৬৩ তম স্থান অর্জন করেছি। আবার নামাজ পড়ে শুকরিয়া আদায় করলাম। আমি জিতে গেছি। আমার কষ্ট সফল হয়েছে। মা বাবাকে জানালাম। সবাই অনেক খুশি।এই আনন্দ বলে বুঝাতে পারবো না। 

 যারা আমাকে পড়তে দিত না,তারাও খোঁজ নেয়। যারা হিংসা করেছিল তারাও ভালোবাসা দেয়। ওই দিন গুলো এখনো মনে পড়ে যখন খিদের জ্বালায় পানি খেয়ে পড়াশোনা করেছি। আজও ডায়েরির পাতা খুললে অজান্তেই চোখে পানি আসে। “

কি কেমন লাগলো? 

কমেন্টে জানাতে ভুলবে না। ও হ্যাঁ, ওই ঢাবিয়ানটা হলো আমিই,গরীব রাজপুত্র।

তারপর ঢাবিতে এক বছর পড়েছি। কয়েকটা টিউশন করে, একটা খ্যাতনামা ভর্তি কোচিংয়ে ক্লাস নিয়ে অনেক ক্লান্ত থাকতাম। বাসায় পড়াশোনা করার কোনো এনার্জি ছিল না। তারপরও আল্লাহর রহমতে অনেক ভালো একটা সিজিপিএ তুলেছিলাম। আসলে আমার জন্য সারাদিন পরিশ্রম করে পড়াশোনা করাটা অনেক কষ্টের ছিল। আমার অনেক স্বপ্ন ছিল যে আমি বাইরের কোনো দেশে স্কলারশিপ নিয়ে পড়বো। তুরস্কের সিরাত ইউনিভার্সিটিতে একটা স্কলারশিপ পেয়েও ছিলাম। কিন্তু পরিবারের সাপোর্ট ও আনুষঙ্গিক খরচের সার্মথ্য না থাকায় পরে আর যাওয়া হয়নি।আমি তবুও চেষ্টা ছেড়ে দেয়নি। আমি বিশ্বাস করি,যে স্বপ্ন দেখতে জানে, সে পূরণ করতেও জানে। অনেক আশা নিয়ে ভারত সরকারের বৃত্তি – আইসিসিয়ারের জন্য আবেদন করি। লিখিত পরীক্ষায় আমার সিরিয়াল অনেক সামনের দিকেই ছিল। ভাইভার আগের দিন আমার দাদা মারা যায়। আবার সেই রাতে গাইবান্ধা ভ্রমণ করে রাতে এসেই সকালে ভাইভায় উপস্থিত হই। আল্লাহর রহমতে আমি ভারতের কেরালা রাজ্যের কালিকাট ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতিতে অনার্স পড়ার সুযোগ পাই। সেই সাথে কালিকাট ইউনিভার্সিটিতে আমি প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে পড়ার সুযোগ পাই। এখন আমি একজন আন্তর্জাতিক স্কলার এবং কালিকাট ইউনিভার্সিটিতে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে সেন্ট জোসেফ কলেজে পড়ছি। এখন আরো স্বপ্ন দেখি – আরো বড় কিছু করার। আমি জানি আমি পারবো। কারণ, হার মানাটা আমাকে মানায় না। 


আরিফ আল আমিন,

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

এক্সেকিউটিভ,এইচ আর এম বিভাগ, সিলসা।

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *